মোটেই বিশ্বাস করতে পারছে না ধর্ম আপনাকে ঠকাচ্ছে?

পৃথিবীতে ৪০০০ ধর্ম রয়েছে
পৃথিবী প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার বেগে পশ্চিম থেকে পূর্বে ঘুরছে। তার মানে হচ্ছে, আপনি যে জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে আছেন আপনাকে সহ সেই জায়গাটি প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার পূর্বে সরে যাচ্ছে। বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে এসেও, এই কথাটি কত জন মানুষই বা জানে? অথচ এটি বিজ্ঞানের একেবারে ব্যাসিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠিত সত্য কথা। কিন্তু আপনি যদি কোনো অল্পশিক্ষিত অথবা অশিক্ষিত মানুষের সামনে গিয়ে কথাটি বলেন তাহলে সে কষে আপনাকে একটা থাপ্পড় মেরে দিবে। থাপ্পড় খাওয়ার খুব অদ্ভুত একটি কৌশল তাই না?


তবে অবাক হওয়ার কিছুই নেই। কারণ বিজ্ঞানের জ্ঞান ছাড়া একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে এ কথা মেনে নেওয়া খুবই কষ্টকর। তবে পৃথিবী ঘুরছে এটা যেমন ১০০ ভাগ সত্য, তেমনি আরও একটি সত্য হলো, পৃথিবীতে ৪০০০ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সবগুলো ধর্মই শতভাগ মিথ্যা, ভন্ডামি এবং সুবিধা আদায়ের সুকৌশলী মাধ্যম।

প্রথমে বলি। কেন আমরা বুঝতে পারিনা পৃথিবী ঘুরছে? কারণ আমাদের চোখের এবং জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। কোনো কিছু ঘুরছে বা চলছে সেটা বুঝতে হলে তার পাশে স্থির কোনো বস্তু থাকা চাই। পৃথিবীর আশেপাশেই স্থির কোন বস্তু নেই, যাকে দেখে বোঝা যাবে পৃথিবী ঘুরছে।

বুঝতে একটু কষ্ট হলে আরও সহজ করে বলি। ধরুন আপনি ট্রেনে করে ঢাকা থেকে সিলেট যাচ্ছেন। জানালা দিয়ে লক্ষ্য করে দেখবেন, ট্রেন যদি গাছপালা বা বনের ভেতর দিয়ে যায় তাহলে মনে হবে ট্রেন খুব দ্রুত ছুটছে। আবার যখন ফাকা মাঠের ভেতর দিয়ে যাবে তখন দূরের কোন মোবাইল টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে দেখবেন মনে হবে ট্রেন খুব ধীরে যাচ্ছে। পৃথিবীর আশেপাশে নিকটবর্তী গ্রহ নক্ষত্রগুলোও লক্ষ-কোটি কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। তাই প্রযুক্তির জ্ঞান ছাড়া পৃথিবীর ঘূর্ণন পর্যবেক্ষণ করা আমাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

ভাবছেন পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে ধর্মের কি সম্পর্ক? সম্পর্ক আছে। তবে আপাতত এটি একটি উদাহরণ। তবে চলুন আর একটি উদাহরণ দেখে আসি। বিশেষ করে, শরৎকালের সন্ধ্যার একটু পর বা রাতে আকাশে তাকিয়ে দেখবেন, হালকা মেঘের মতো একটি দাগ উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত হয়ে আছে। এর নাম ছায়াপথ। আমাদের পৃথিবী ও সৌরজগত এই 'মিল্কিওয়ে' ছায়াপথের ভেতরে অবস্থিত। এটি প্রায় ১ লক্ষ আলোকবর্ষ বিস্তৃত। নিচের ছবিটি লক্ষ্য করুন।
পৃথিবী থেকে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ দেখতে যেমন
রাতের আকাশে তাকালে মিল্কিওয়ে ছায়াপথকে ঠিক এমন দেখায়। কিন্তু আসলেই কি ছায়াপথ দেখতে এমন? প্রকৃতপক্ষে ছায়াপথ দেখতে মোটেও এরকম না। আগেই বলেছি আমাদের চোখের সীমাবদ্ধতা আছে। সম্পূর্ণ ছায়াপথটি এতই বড় যে, আমাদের দৃষ্টিসীমায় ধরা পড়ে না। তাই আমরা এর ক্ষুদ্রতম একটি অংশ দেখি। ছায়াপথ কে বাইরে থেকে দেখলে অনেকটা মশার কয়েলের মত লাগবে। এবার নিচের ছবিটি লক্ষ্য করুন।
বাইরে থেকে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ
এবার আসি কাজের কথায়। ঘরের বাহ্যিক অবস্থা যেমন ভেতর থেকে বোঝা সম্ভব নয়, ঠিক তেমনি ধর্মের ভেতরে থেকে ধর্মের আসল রূপ বোঝা সম্ভব নয়। সেটা বুঝতে হলে একটু বাইরে থেকে তীক্ষ্ণভাবে দৃষ্টিপাত করতে হবে।

আমরা যে সমাজে বসবাস করি, ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠা হয়। জন্মের শুরু থেকেই যেমন আমাদের পিতা, মাতা আত্নীয় স্বজনদের চিনি দেয়া হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে আরো একজন ব্যক্তিকে চিনিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি হচ্ছেন ঈশ্বর। তবে আমরা বাবাকে দেখেছি, মাকে দেখেছি ভাইকে দেখেছি, বোনকে দেখেছি। কিন্তু ঈশ্বরকে কি দেখেছি? না তো, দেখিনি। তিনি অদৃশ্য। অনুভব করেছি? না। কোথাও তার কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ পেয়েছি? Absolutely না। শুধু আমরা একা নয়। আমাদের বাবারাও দেখিনি, তাদের বাবারাও দেখিনি, এবং তাদের বাবারাও দেখিনি। তাহলে দেখেছে টা কে?

আজ পর্যন্ত সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব কেউ খুঁজে না পেলেও আমরা মন প্রাণ দিয়ে তাকে ভক্তি করি। বিপদের সময় তাকে ডাকি, ভয় পেলে তাকে স্মরণ করি। এই অস্তিত্বহীন সত্তাকে দেখতে বা বুঝতে না পারলেও মনের ভেতর তার জন্য একটা বিশেষ স্থান রেখে দিয়েছি। সে যেন চিরচেনা আপন কেউ।


পথে-ঘাটে শহরে-বন্দরে সব জায়গায় ঈশ্বরের গুনোগান শোনা যায়। শুধু তাই নয়, তাঁর প্রেরিত বার্তাবাহকদের সুনাম অহরহ। হাজার হাজার বই পুস্তক লেখা হয়েছে তাদের নামে এবং সুনামে। পৃথিবীতে শত কোটি ভক্ত আছে তাদের। যারা ঈশ্বর এবং তাঁর প্রেরিত বার্তাবাহক দের জন্য জীবনও দিতে পারে। পৃথিবীতে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে মাহফিল, সভা ও সমাবেশের আয়োজনের মাধ্যমে তাদের সুনাম ও গুণগান করা হয়। অথচ তাকে কোনো দিন দেখিনি।

চারপাশে যখন এতো পজিটিভ, এ ধরনের পরিস্থিতিতে কেউ যদি এসে বলে ঈশ্বর নেই। ধর্মগুলো মানুষেরই সৃষ্টি। কিছু মানুষ নিজেদের সুবিধা আদায়ের জন্য নিজেকে ঈশ্বরের প্রেরিত দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা ছিলো খুনি। সম্পদ এবং নারীলোভী ইত্যাদি। শুনে রীতিমত হৃদয়ে ধাক্কা লাগবে। মনে হতেই পারে, তরোয়াল টা নিয়ে এসে তার মুন্ডুটা দুভাগ করে দিতে। এবং অনেকে সেটা করেও। তবে ঈশ্বরকে আমরা কেউই দেখিনি।

শুনতে তেতো হলেও সত্য এই যে, আমাদের ভেতর ৮০ ভাগ ধার্মিকই নিজের ধর্ম গ্রন্থের পাতা উল্টিয়েও দেখেনি ধর্মগ্রন্থে কি লেখা আছে। ধর্মগ্রন্থের ভাষা ভিন্ন হওয়ায়, অনেকে পড়ে কিন্তু বুঝে না। বাকি ১০ ভাগ? এরাই হচ্ছে ধর্ম ব্যবসায়ী। এরা পড়ে এবং বোঝেও। দুঃখ, এটাই তাদের রুটি-রুজি।  এই ১০ ভাগ ধার্মিকদের কথায় বাকি ৯০ ভাগ উঠে আর বসে।

গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন মাজারে হাজার হাজার ভক্ত অনুরাগী আসে কাঠালের পাতা পড়া, চিনি পড়া, ডিম পড়া ইত্যাদির মাধ্যমে রোগ সারাতে। গুজব শুনে, বাঁশের কঞ্চির পানি খেয়ে রোগ ভালো করার জন্য হাজার হাজার মানুষ ভোর রাতে উঠেছিলো একবার। কিছুদিন আগেও উত্তরবঙ্গে একটা গুজব উঠেছিলো, বিলের পচা কাদায় গোসল করলে নাইক সব রোগ সেরে যাচ্ছে। ভারতে গরুর মুত্র খেতে শোনা যায় প্রায়ই। তারা এগুলোকে মনে প্রাণে সত্য ভেবেই পালন করে।

কি হলো? বোরিং ফিল করছেন? মনে হচ্ছে এসব কথা শুনিয়ে লাভ কি, এসব তো ভন্ডামি। হ্যা, এগুলো আপনার কাছে মনে হচ্ছে পুরাই ফালুতু এবং ভন্ডামি। তবে জানেন কি আপনার প্রিয় ধর্ম আপনার কাছে যেমন সত্য, তারা এগুলোকে ঠিক একই ভাবে সত্য মনে করেই এ ধরনের পাগলামি করে যাচ্ছে? আপনি যদি একজন মুসলিম হয়ে থাকেন এবং হিন্দুদের গো-মুত্র খাওয়া যেমন আপনার কাছে ভন্ডামি মনে হয়, আপনার ধর্ম বিশ্বাসও, অনেকের কাছে ভন্ডামি মনে হয়!

ধর্মাবলম্বীরা প্রতিদিন ধর্মের পেছনে অসংখ্য সময় ব্যয় করে, ধর্মের বহু অপ্রয়োজনীয় নিয়ম মেনে চলে, অথচ ধর্মের উৎপত্তি এবং তার উদ্যেশ্য খোজার চেস্টাও কোনো দিন করেনি, এমন লোকের সংখ্যা অগণিত।
বন্য প্রানীর বিবর্তন থেকে ধীরে ধীরে মানুষের আবির্ভাব
পৃথিবীতে মানুষ আবির্ভাবের ইতিহাস
পৃথিবীর বয়স ৫০০ কোটি বছর। পৃথিবীতে আজ থেকে প্রায় ৩০ কোটি বছর আগে জীবনের উদ্ভব। ফসিল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে আজ থেকে প্রায় ৪০ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকা মহাদেশে অস্ট্রালোপিথেকাস জাতীয় প্রাণীরা বাস করত। এবং আজ থেকে ১৫ লক্ষ বছর আগে হোমো ইরেক্টাস (“দন্ডায়মান মানব”) এর আবির্ভাব ঘটে। হোমোস্যাপিয়েন্স বা মানুষ কমপক্ষে ২ লক্ষ বছর আগে এই পৃথিবীতে এসেছে।

ঐতিহাসিকদের তথ্য অনুযায়ী ধর্মের ইতিহাস
মানুষের আবির্ভাব আজ থেকে ২ লক্ষ বছর আগে হলেও ধর্মের ইতিহাস কিন্তু সে তুলনায় খুবই নগন্য। আজ থেকে ১০ হাজার বছর বা তার আগে মানুষের চিন্তা, ভাবনার উন্নতি হতে থাকে। এর আগেই তারা ভাষা আবিষ্কার করে ফেলে। সেসময় মানুষ ‘প্রাকৃতিক পরিবেশে’ বসবাস করতো। আদিম কাল থেকে তারা নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতো। ঐ সমস্ত দুর্যোগ থেকে আত্মরক্ষার জন্য নানাবিধ প্রাকৃতিক শক্তির কাছে প্রকাশ্যে বিনয়ের সাথে আত্মসমর্পন করে কান্নাকাটি করতো এবং খুশি করার জন্য পূজো ও দিতো। এভাবে ভয়ের কারণে আত্মরক্ষার তাগিদে শুরু হয় প্রকৃতিপূজা বা ধর্মীয় আচরণ। সেখান থেকেই মুলত ধর্মের সৃষ্টি। আজ থেকে ৬ হাজার বা ৭ হাজার বছর পূর্বে পৃথিবীতে ধর্মের আবির্ভাব ঘটে।
সভ্যতার দিকে ধাবিত হচ্ছে মানুষ
কোনো কিছু যেমন একবারে পরিপূর্ণ হয়না, ধর্মও ঠিক তেমন। সময়ের ধাপে ধাপে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে তুলনামুলকভাবে কিছু কিছু বুদ্ধিমান লোকের আর্বিভাব হয়। তারা নিজেকে নেতা বা অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তারা মুরব্বী বা অভিভাবক হিসেবে নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে নানাবিধ দাবি খাটাতো। এছাড়া বিপদ আপদ না আসার জন্য নানাবিদ তন্ত্র মন্ত্র, পূজো প্রার্থণা এসব ছিল তাদের মৌলিক দায়িত্ব। এভাবে যুগ ও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এরা হয়ে উঠলো এক শ্রেণীর অঘোষিত “সমাজ সর্দার”। কোনো দেবতার দ্বারা সাহায্য লাভ কিংবা কোনো অপশক্তির বিরুদ্ধে কখন কি ভাবে মোকাবেলা করতে হবে তার দায়ভাগ তাদের উপর গুরু দায়িত্ব হিসেব অর্পিত হলো।

বিনিময়ে সেই ব্যক্তি সমাজের নানাবিধ সুযোগ সুবিধাও হাতিয়ে নিতে থাকলো। তাদের হাতে থাকতো উপাসনালয়ের কর্তৃত্ব, অদৃশ্য ইশ্বর কিংবা দেবতাদের কাছে নিজেদের ভুল ত্রুটির কৈফিয়ত দিতো। এভাবে গোষ্ঠী কর্তৃক স্বীকৃত (কিংবা স্বঘোষিত) ইশ্বরের প্রতিনিধিরা কালের স্রোতে নিজেদেরকে সমাজসেবী হিসেবে করেছে প্রতিষ্ঠিত। প্রথমে তা করা হয়েছে নিজ এলাকায়, নিজের সমাজে। যেখানে সামাজিক অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলায় ছিল ভরপুর। এই সমাজ সেবা করতে গিয়ে পৃথিবীর মানুষের মাথায় নানাবিধ আইন কানুন বাধ্যতামুলক ভাবে বেধে দেয়া হয়। ধীরে ধীরে এভাবেই সৃষ্টি হয় ধর্মের এবং ধর্ম প্রচারকদের।

ধর্মের ইতিহাস থেকে জানা যায় পৃথিবীতে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বেশী ধর্মের উৎপত্তি হয়েছিল। এতদ্ব্যতীত ভারতে এবং ইউরোপের গ্রীস ও ইতালীতে ধর্মের প্রবল প্রতাপ ছিল। ধারণাগত মিল থেকে ধর্মতাত্ত্বিকগণ ধারণা করেন যে, একেশ্বরবাদী বা ইহুদি ধর্মের ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে খ্রিস্ট ধর্ম, ইসলাম ধর্ম ইত্যাদি ইব্রাহিমীয় ধর্ম।

বিজ্ঞান এবং ধর্ম
আধুনিক বিজ্ঞান এবং ধর্মগুলোর মধ্যে সাংঘর্ষিকতায় পূর্ণ। অধিকাংশ ধর্ম মতে, ঈশ্বর এক জোড়া মানুষ পৃথিবীতে ফেলে দেয়, সেখান থেকে সন্তান জন্ম দিতে দিতে আজকের এই অবস্থা। তবে বিজ্ঞান বলে, পৃথিবীতে এক জোড়া মানুষ একবারে আসেনি। কোটি কোটি বছর ধরে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে বিভিন্ন প্রাণীর বিবর্তনের মাধ্যমে আজকের মানুষ সৃস্টি হয়েছে। এবং ভাষা, পোষাক, আবাস একবারে তৈরি হয়নি। এবং মানুষ এখনও বিবর্তিত হচ্ছে।

বিভিন্ন ধর্মে স্পষ্ট ভাবে বলা আছে আকাশ ও পৃথিবী সৃস্টি হয়েছে মাত্র সাত দিনে। তবে আধুনিক বিজ্ঞান বলে পুরো মহাবিশ্ব তৈরি হতে (আজকের অবস্থানে আসতে) ১৩.৭৫ বিলিয়ন লেগেছে। এবং আকাশ বলতে আদতে কিছুই নেই। উপরের দিকে তাকালে আমরা যে নীল আকাশ দেখতে পাই সেটা হচ্ছে আমাদের দৃষ্টিভ্রম।

এছাড়াও ধর্মের হাজারও কুসংস্কার, বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় নিষেধাজ্ঞা, আদেশ, নির্দেশ মানুষকে বিজ্ঞান চর্চায় এবং স্বাভাবিক বা মুক্ত জীবনযাপনে বাধা দেয়। শুধু বিজ্ঞান নয়, এটি সামাজিক ভাবেও অত্যান্ত ক্ষতিকর। ধর্ম একজন নারীকে পন্য হিসেবে তুলে ধরে। পৃথিবীতে জঙ্গিবাদের মুল কারণও ধর্ম। (সংক্ষেপিত)

- লেখকঃ মোমিন শেখ

তথ্যসুত্র
https://bn.wikipedia.org/wiki/বিশ্বের_ইতিহাস
https://bn.wikipedia.org/wiki/মানুষ
https://bn.wikipedia.org/wiki/মহাবিস্ফোরণ_তত্ত্ব

ফেরাউনের লাশ এর আসল রহস্য - অলৌকিক নাকি উপকথা?

ফেরাউন বা দ্বিতীয় রামিসেস
লেখক - মোমিন শেখ
ইসলাম যে মিথ্যা একটি ধর্ম এবং কোরআন যে স্বঘোষিত নবী মোহাম্মাদের তৈরি গল্পের বই, তা প্রমানের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে ফেরাউন নিয়ে সুরার আয়াত, যা ধর্মান্ধদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয়। পবিত্র কোরআনে খুব সুন্দর ভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে ফেরাউন এর লাশের মুখরোচক গল্প বর্ণনা করা হয়েছে। যা শুনলেই মনে হবে ইসলাম আসলেই একটা অলৌকিক ধর্ম। ফেরাউন সম্পর্কে কোরআনের ২৭ টি সুরায় ৭৫টি স্থানে আলোচনা করা হয়েছে।

"বনী ইসরাইলকে আমি পার করে দিয়েছি নদী, অত:পর তাদের পশ্চাদ্ভাবন করেছে ফেরাউন ও তার সেনাবাহিনী, দুরাচার ও বাড়াবাড়ির উদ্ধেশ্যে, এমনকি যখন তারা ডুবতে আরম্ভ করলো, তখন বলল, এবার বিশ্বাস করে নিচ্ছি কোন মাবুদ নেই তিনি ছাড়া যার ইবাদত করে বনী ইসরাঈলরা। অতএব আজকের দিনে রক্ষা করছি আমি তোমার দেহকে যাতে তা তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হতে পারে। নি:শন্দেহে বহু লোক আমার মহাশক্তির প্রতি লক্ষ্য করে না।" (সূরা ইউনুস:৯২)। 


কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, মুসলিম জনগোষ্ঠী বিশ্বাস করে, ফেরাউন নবী মুসাকে ধাওয়া করলে, এক সাগরের তীরে আসে। মুসার লাঠির আঘাতে সাগর শুকিয়ে রাস্তা হয়ে যায়, এবং তারা পার হয়ে ওপারে চলে যায়। ফেরাউন সেই রাস্তা দিয়ে পার হওয়ার সময় ডুবে মারা যায়। এবং আল্লাহ মানবজাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেখানোর জন্য নিদর্শন হিসেবে ফেরাউনের লাশকে অক্ষত অবস্থায় রেখে দেয়, যা থাকবে কেয়ামতের আগ পর্যন্ত। পরে সাগর থেকে উদ্ধার করে জাদুঘরে রাখা হয়।

বড় বড় নামের টাইটেলওয়ালা হুজুরদের কাছে জিজ্ঞাসা করলে আরও জানা যায়, ১৯৮১ সালে তৎকালীন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোঁয়া মিতেরা মমি করে রাখা ফেরাউনের লাশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণার জন্য তা ফ্রান্সে পাঠাতে মিশর সরকারের কাছে অনুরোধ করেন। ফেরাউনের লাশ সংক্রান্ত গবেষক টিমের প্রধান ছিলেন মরিস বুকাইলি। ফেরাউনের লাশ সংরক্ষণ অন্য গবেষকদের উদ্দেশ্য হলেও বুকাইলি নিজে ফেরাউনের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে উদগ্রীব ছিলেন। কয়েক ঘণ্টা গবেষণার পর ফেরাউনের লাশে লবণের কিছু অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়।  ফলে স্পষ্ট হয় যে সাগরে ডুবেই ফেরাউনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর পর তার লাশ সাগর থেকে উঠিয়ে এনে মমি করা হয়। এবং সাথে সাথেই মরিস বুইকালি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

তাহলে এটাই কি আসল ঘটনা? মোটেই না। চলুন ফেরাউনের মমির আসল ঘটনা জেনে আসি। তবে তার আগে মরিস বুকাইলি সম্পর্কে একটু জেনে আসা যাক।

মরিস বুকাইলি ছিলেন একজন ফরাসি চিকিৎসক। ১৯৭৩ সালে, তিনি সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সালের পরিবারের চিকিত্সক নিযুক্ত হন.একই সাথে মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের পরিবারের সদস্যরা তার রোগী ছিল। মরিস বুকাইলি ইসলামের একজন একনিষ্ঠ গবেষক ছিলেন, তবে তিনি কখনো ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত কোন তথ্য পাওয়া যায় নাই। - সুত্র উইকিপিডিয়া

মরিস বুইকালির নামে অভিযোগ আছে তিনি সৌদি আরব সরকারের টাকা খেয়ে একটা বই লিখেছিলেন ইসলাম সম্পর্কে। পরে সেই বই এর কড়া সমালোচনায় অন্য একটি বই বের করা হয়। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে লাশ নিয়ে গবেষনা কতটা নিখুত ছিলো। ফেরাউনের লাশে লবন পাওয়া গিয়েছিলো বলেই যে সেটা সমুদ্রে থাকবে এমন কোনো কথা নাই। প্রাচীনকালে লাশ মমি করতে হলে লবনের দ্রবনে ডুবাতে হতো।

এবার আসি আসল কথায়। 

ফেরাউন কার নাম?
ফেরাউন (Pharaoh) কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম নয়। প্রাচীন মিশরীয় রাজাদের উপাধি ছিল ফারাও। আরবরা বলতো ফেরাউন। শুধু পুরুষ রাজা নয়, ফেরাউন শব্দটা মহিলা শাসকদের হ্মেত্রেও ব্যবহার করা হত। মিশরে ৩৩২ জন রাজা রাজত্ব করেছিলেন, তাদের সবাইকেই ফারাও/ফারাউন বলা হতো। কোরআনে কোনো নির্দিষ্ট ফিরাউনের নাম উল্লেখ করা হয়নি বরং উক্ত কাহিনীতে শুধুমাত্র ফেরাউন উল্লেখ করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি অজ্ঞতা। আপনি শুধুমাত্র রাজা/প্রেসিডেন্ট/প্রধানমন্ত্রী বলতে কাকে বুঝবেন?

ফেরাউনের লাশ কি সাগর থেকে উদ্ধার করা হয়?
মুসলিমদের দাবি অনুযায়ী, ফেরাউনের লাশ লোহিত সাগরের তলদেশ থেকে আবিষ্কার করা হয়েছে। এটি একটি বড় রকমের মিথ্যাচার। নদী/সাগরের তলদেশ থেকে কোনো মমিই উদ্ধার করা হয়নি। ১৮৮১ সালে যেই মমিটি পাওয়া যায়, সেই মমিটি দ্বিতীয় রামিসেসের। তাঁর মমি উদ্ধার করা হয়েছে DB320 নামে একটা সমাধিতে। সেখানে দ্বিতীয় রামিসেস ছাড়াও আরও ৫০ টি মমি উদ্ধার করা হয় একই সাথে। তবে, দ্বিতীয় রামিসেসকে প্রথমে KV7 নামে একটা সমাধিতে রাখা হয়েছিল। পরে সেখান থেকে তাকে Pinudjem II এর মমির পাশে DB320 এ স্থানান্তর করা হয়।

ফেরাউন বলে যাকে দাবি করা হচ্ছে, তার পরিচয় কি?
দ্বিতীয় রামিসেস নামের এই ফেরাউনের জন্ম (প্রায়) খ্রিস্টপূর্ব ১৩০৩; মৃত্যু জুলাই বা আগস্ট ১২১৩ খ্রিস্টপূর্ব; শাসনকাল হচ্ছে, ১২৭৯–১২১৩ খ্রিস্টপূর্ব। তাকে রামিসেস দ্য গ্রেট বা মহান রামিসেস বলা হতো। তিনি ছিলেন মিশরের উনবিংশতম রাজবংশের তৃতীয় ফারাও রাজা। যারা বলে থাকে তার লাশ সাগর থেকে তোলা হয়েছে, হয় তাঁর মিথ্যা বলে বা তারা আসলেই জানেই না আসল ঘটনা। রামেসিস ২ সম্পর্কে জানতে এখানে ক্লিক করুন

ফেরাউন কি সাগরের পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিলো?
ইসলাম ধর্ম এবং মুসলিমদের দাবি অনুযায়ী, ফেরাউন নবী মুসাকে ধাওয়া করতে গিয়ে সাগরের পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। অথচ ফিরাউন বা দ্বিতীয় রামিসেস মৃত্যুবরণ করেছেন আর্থ্রাইটিস নামক এক রোগে। এটি প্রায়ই বৃদ্ধ বয়সের মানুষদের হতে দেখা যায়। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, দ্বিতীয় রেমেসিস সাগরে ডুবে মরেননি। ইসলাম ধর্মের নবী মোহাম্মাদ ওই সময় আবছা আবছা যা শুনেছিলো তাই ভুল করে কুরআনে লিখে রেখেছিলেন।

কোরআনে তো মুসা নবীর সাগর ভাগ করা আর ফেরাউনের ডুবে যাওয়ার ঘটনা আছে। কিন্তু মোহাম্মাদ এত বছর আগে ফেরাউনের লাশের ভবিষ্যৎবাণী করলো কিভাবে?
ফেরাউন আর মুসাকে নিয়ে বানানো গল্প শুধু কুরআনে না, বরং পূর্বের কয়েকটি প্রধান ধর্মগ্রন্থেও বর্ণিত হয়েছে অনেক আগেই, যা ছিলো বিভিন্ন জায়গার আঞ্চলিক উপকথা মাত্র। মোহাম্মাদ হিব্রু বাইবেল থেকে সরাসরি কপি-পেস্ট করে কুরআনে ঢুকিয়েছে। এবং খাদিজার চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবনে নওফেল এ কাজে সহযোগিতা করেছেন। আর নবী মুহাম্মদের সময়কালে প্রাচীন মিশরীয় মমির কথা সকলেরই জানা ছিল। তাই ফেরাউনরা মৃত্যুর পর তাদের লাশ সংরক্ষণ করে রাখে মমি করে, এটা ইসলামের নির্মাতা মুহাম্মদ অবশ্যই শুনেছেন। তাই, কোরআনে ঐ সাগর দুই ভাগ হওয়ার কিচ্ছা ও লাশ সংরক্ষনের ঘটনা জুড়ে দেয়া নিশ্চয়ই কোনো মোজেজা নয়। কুরান ও বাইবেল লিখিত হওয়ার হাজার বছর আগেই যা ঘটে গেছে, সেই জানা ঘটনার উল্লেখ থাকা কোনো কৃতিত্বের কাজ নয়।

তাহলে ফেরাউনের লাশ এতো বছর ধরে এখনও অক্ষত থাকে কিভাবে?
নবী মোহাম্মাদ রচিত কোরআনে মাত্র একজন মানুষের লাশ অক্ষত থাকার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আপনি যদি মিশরের যাদুঘরগুলোতে যান, দেখবেন হাজার হাজার লাশ অক্ষত আছে এখনও। মিশর ছাড়াও আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়া অঞ্চলের আরও প্রায় ২০-২৫ টি দেশে বহু মমি আবিষ্কৃত হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে, ঐ মমিগুলো কে সংরক্ষণ করেছে ভবিষ্যৎ নিদর্শন হিসেবে? চলুন দেখি কিভাবে মমি গুলো কিভাবে সংরক্ষন করা হতো।



প্রাচীন মিশরীয়রা ছিলো অত্যান্ত বুদ্ধিমান। তারা আধুনিক সভ্যতায় অনেক অবদান রাখে। মমি তৈরি করার জন্য তারা প্রথমে লাশের পেট কেটে শরীরের বিভিন্ন পচনশীল অঙ্গ যেমন - ফুসফুস, বৃক্ক, পাকস্থলি ইত্যাদি বের করে আনতো। এসব অঙ্গ বের করার পর আবার পেট সেলাই করে দেয়া হতো। মগজ অর্ধতরল করে ফেলতো ও লোহার হুক দিয়ে টেনে বের করে আনতো। তারপর ন্যাট্রন লবণ সহ অন্যান্য বিভিন্ন প্রাকৃতিক লবণের দ্রবণে মাস তিনেক ডুবিয়ে রেখে তুলে আনা হতো। এরপর রোদে শুকানোর পালা। পরিপূর্ণভাবে লাশটা শুকিয়ে গেলে এটাকে ব্যাকটেরিয়া-বিরোধী করে তৈরি করা এক ধরনের ব্যান্ডেজে মুড়িয়ে ফেলা হতো। অবশেষে কাঠের বাক্সে প্যাকিং!

সুতরাং বোঝাই যায়, ইসলাম এবং কোরআন কতটা অলৌকিক। পুরোনো গল্প/উপকথা নতুন করে সাজিয়ে প্যাকিং করে বাজারজাত করার অর্থই হচ্ছে ইসলাম। আর বোকা মানুষদের মগজধোলাই করার জন্য শানে নুজুল তো আছেই।