সম্পূর্ণ হীরার তৈরি বিশাল নক্ষত্র যার দাম পুরো পৃথিবী বিক্রি করলেও উঠবে না

ডাইমন্ড স্টার
পৃথিবীতে পাওয়া সবচাইতে বড় হীরা হল ক্যালিনান ডায়মন্ড। এর ভর ৬২১.৩৫০ গ্রাম এবং একে পাওয়া গিয়েছিল ১৯০৫ সালে দক্ষিন আফ্রিকার কোনো একটি জায়গায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া সবচাইতে বড় হীরা এটি না ! এমনকি এটি পৃথিবীতেও অবস্থিত না ! আর পৃথিবীতে থাকতই বা কীভাবে ? এই হীরার আকৃতি পৃথিবীর চাইতেও বড় আর ভরে সূর্যের ভরের ১.০৫ গুন । মহাজাগতিক এই দানব হিরাটির অবস্থান ৯০০ আলোকবর্ষ দূরে কুম্ভ নক্ষত্রমণ্ডলে (Aquarius constelltion) ! মুলত এটি একটি শ্বেত বামন বা White Dwarf নক্ষত্র। সূর্যের মত প্রধান ধারার নক্ষত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে কেন্দ্রে হাইড্রোজেন গ্যাস ফিউশন বিক্রিয়ায় ব্যাবহার করে তাপ ও আলো উৎপন্ন করে। বিক্রিয়া্র ফলে অপেক্ষাকৃত ভারী মৌল হিলিয়ামও উৎপন্ন হয়।যখন নক্ষত্রটি হাইড্রোজেন জ্বালানী নিঃশেষ করে ফেলে তখন এটি এর কেন্দ্রীনস্থ হিলিয়াম পোড়াতে শুরু করে। হিলিয়াম থেকে আবার কার্বন,অক্সিজেন,নাইট্রোজেন উৎপাদন হতে শুরু করে।

ভর বিবেচনায় একেক নক্ষত্রের পরিনতি একেক রকম । নক্ষত্রের বিবর্তনের সম্ভাব্য একটি পরিনতি হল শ্বেত বামন । যদি কোনো নক্ষত্রের মোট ভর সূর্যের ১.৪১ গুণের সমান বা তার চেয়ে কম হয়, তাহলে ওই নক্ষত্র শেষ দশায় শ্বেত বামন তারায় পরিণত হয়। হাইড্রোজেন জ্বালানী শেষ করার পরে এটি যখন হিলিয়াম পড়ানোর প্রস্তুতি নেয় তখন এটি প্রসারিত হয়ে রেড জায়ান্ট না লোহিত দানব নক্ষত্রে পরিণত হয় । এই সময় এদের ব্যাস বেড়ে সূর্য ও পৃথিবীর সমান দূরত্বের হয় । তবে এর কেন্দ্রে ভারী মৌল জমে থাকায় এটির প্রসারনের বিপরীতে মহাকর্ষ একে সংকুচিত করতে চায় । লোহিত দানব তারা'র অভ্যন্তরভাগ অতি সঙ্কোচনের কারণে, যখন এর আভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ১০^৮ কেল্ভিন এবং ঘনত্বের পরিমাণ ১০^৮ গ্রাম/বর্গ সেন্টিমিটার হয়, তখন নক্ষত্রের ভিতরে জমে থাকা হিলিয়ামের দহন শুরু হয়। প্রথাবস্থায় হিলিয়াম সংযোজিত হয়ে বেরেলিয়াম-৮ তৈরি করে।এরপর বেরিলিয়াম-৮ এর সাথে আরও একটি হিলিয়ামের সাথে যুক্ত হয়ে তৈরি হয় কার্বন-১২ তৈরি করে। এই অবস্থায় হিলিয়াম ঝলক (helium flash)- এর সৃষ্টি হয়। হিলিয়াম শেষ হয়ে গেলে নক্ষত্রটি গ্য্যাস নিঃসরণ করতে থাকে । নিঃসৃত গ্যাস থেকে গ্রহান্বিত নিহারিকার জন্ম ঘটে । আর হিলিয়াম দহন শেষে নক্ষত্রটির ভারী মৌল সমৃদ্ধ কেন্দ্রীণ বা কোর শ্বেত বামন (white dwarf) নক্ষত্রে পরিণত হয়। শ্বেত বামন নক্ষত্র এত ঘন যে সূর্যের সমান ভরসম্পন্ন একেকটি শ্বেত বামন নক্ষত্রের আকৃতি পৃথিবীর সমান মাত্র ।

আমাদের আলোচিত শ্বেত বামন তারকাটিকে খুজে পাওয়া সহজসাধ্য ছিল না । নেদারল্যান্ডের একদল বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুযায়ী স্থান-কাল জালে পালসারের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছিলেন । ২০১৪ সালে ডাচ ইন্সটিটিউট অফ রেডিও অ্যাস্ট্রোনমির(ASTRON) গবেষকেরা ৯০০ আলোকবর্ষ দূরে একই অঞ্চলে PSR J2222-0137 নিয়ে গবেষণা করছিলেন । কিন্তু পালসার থেকে নিঃসরিত আলোর ঝলকানি বা ফ্ল্যাশ মাঝে মাঝে পৃথিবীতে আসতে একটু বেশি সময় নিচ্ছিল । পালসার হল একধরনের ঘূর্ণিয়মান নিউট্রন নক্ষত্র ! নিউট্রন নক্ষত্র হল উচ্চ ঘনত্ব যুক্ত নক্ষত্র । এই ধরনের নক্ষত্রের ভর সূর্যের চাইতে সামান্য কিছু বেশি হয় আর এত বিপুল পরিমান ভর মাত্র ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের গোলকের সমান স্থানে পুঞ্জীভূত থাকে । যাই হোক নিউট্রন তারার গঠন আর বিবর্তন নিয়ে অনেক আগেই আমরা জেনেছি ! PSR J2222-0137 পালসারটির ভর ১.১০ সৌরভরের সমান এবং এটি নিজ অক্ষে সেকেন্ডে ৩০ বার আবর্তন করে ।

ডাচ বিজ্ঞানীরা এর ফ্লাশের সময়ক্ষেপণের কারন হিসেবে দ্বিতীয় কোন একটি নক্ষত্র থাকার অনুমান করেন । যার মহাকর্ষীয় প্রভাবে পালসারের ফ্ল্যাশ পৃথিবীতে পৌছাতে কালক্ষেপণ হচ্ছে ! কিন্তু তারা রেডিও ও এক্স রে টেলিস্কোপ ব্যাবহার করে তা সনাক্ত করতে বার্থ হন । তারা অনুমান করলেন যে দ্বিতীয় নক্ষত্রটি বেশ শীতল বিধায় এটি থেকে বিকিরনের হার কম তাই এটি একই সাথে বেশ অনুজ্জ্বলও বটে । এরপর তারা চিলির Southern Astrophysical Research (SOAR) টেলিস্কোপ ব্যাবহার করে সাধারন শ্বেত বামন নক্ষত্রের চাইতে ১০ গুন অনুজ্জ্বল একটি শ্বেত বামন নক্ষত্রের সন্ধান পেলেন । প্রাপ্ত শ্বেত বামন তারকাটির তাপমাত্রা মাত্র ২৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস । যা তারাদের তাপমাত্রার মাপকাঠিতে শীতল ! শ্বেত বামন তারকা কার্বন সমৃদ্ধ হয় এবং এমন তাপমাত্রায় এই কার্বন হীরার মত স্ফটিক বা ক্রিস্টালরূপে থাকে ! তাই ধারনা করা হচ্ছে এই শীতল শ্বেত বামন তারকাটি একটি বিশাল মহাজাগতিক হীরা ! শ্বেত বামন তারকাদের খুব ধীরে ধীরে তাপমাত্রা হ্রাস পেতে থাকে ! আলোচিত শ্বেত বামন তারকাটির বয়স ১১ বিলিয়ন বছর যা আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের বয়সের প্রায় সমান !

পৃথিবীর সবচাইতে বড় হীরা ক্যালিনান ডায়মন্ডের বর্তমান মালিক ব্রিটেনের মহারানি এলিজাবেথ II । তবে মহাজাগতিক এই হীরার নক্ষত্রের মালিক চাইলে আপনিও হতে পারেন ! শুধু যেতে হবে মাত্র ৯০০ আলোকবর্ষ দূরে!
Previous Post
First
Related Posts

0 Comments: