কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিলো আমাদের পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ?

পৃথিবী সৃষ্টির সময়
গ্রহ বা গ্রহানু সৃষ্টিতত্ত্ব জানার আগে সূর্য কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিল তা জেনে রাখা ভালো। আমাদের সূর্য সৃষ্টি হয় সৌর নেবুলা থেকে। আর সৌর নেবুলা সৃষ্টি হয় সুপারনোভা বিস্ফোরণ মাধ্যমে।

সূর্যের চেয়ে তিন গুণ বেশি ভরের নক্ষত্রসমূহের অভ্যন্তরে হাইড্রোজেনের সংযোজন বিক্রিয়ায় তৈরি হয় হিলিয়াম, হিলিয়ামের সংযোজনে তৈরি হয় কার্বন এবং সেই কার্বনের সংযোজনে তৈরি হয় লোহা। লোহা তৈরির মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীণ বিক্রিয়াসমূহের পরম্পরার পরিসমাপ্তি ঘটে, কারণ এর পরের বিক্রিয়াটি তাপশোষী। এমনই এক সময়ে নক্ষত্রের অভ্যন্তরস্থ বহির্মুখী চাপ যথেষ্ট পরিমাণ কমে যাওয়ায় এটি আর মহাকর্ষীয় আকর্ষণ বলকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না, ফলে নক্ষত্রে ঘটে এক প্রচণ্ড অন্তস্ফোটন (Implosion)। নক্ষত্রটির বেশিরভাগ ভরই এর কেন্দ্রে সংকুচিত হয়ে পড়ে, আর গ্যাসীয় বাতাবরণটি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রবলবেগে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনাই সুপারনোভা বিস্ফোরণ হিসেবে পরিচিত। এই ধরনের বিস্ফোরণে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয় এবং সংশ্লিষ্ট নক্ষত্রটি সাময়িকভাবে পুরো ছায়াপথের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কেন্দ্র ছাড়া অবশিষ্ট অংশটুকু বা আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলাকণার মেঘ অর্থাৎ যা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তা নেবুলায় পরিণত হয়।

একইভাবে সৌর নেবুলা সৃষ্টি হয়েছিল। যা প্রায় ১ আলোকবর্ষ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এরপর এই বিশাল আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলাকণার মেঘের ঘূর্ণনবেগ বাড়ার সাথে সাথে এটি সংকুচিত হতে শুরু করলো। ফলে আস্তে আস্তে মেঘের আকৃতি ছোট হতে থাকে । এটি চ্যাপ্টা আকৃতির সাথে সাথে প্রায় ১০০ জ্যোতির্বিদ্যার একক (১ জ্যোতির্বিদ্যার একক= ১৪৯৬০০০০০ কি.মি) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হয়ে যায়।

নীহারিকার মেঘের কেন্দ্র আশেপাশের অন্য অংশ হতে বেশি ঘনত্বপূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে খুব দ্রুত সংকুচিত হতে থাকে। সেখানেই তৈরি হয়ে থাকে আমাদের প্রোটোসূর্য। ধীরে ধীরে এর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং এটি হতে দৃশ্যমান আলো নির্গত হতে থাকে । এরপরে তাপমাত্রা আরও অনেক বাড়ার পর নিউক্লিয় বিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। সৃষ্টি হয়ে যায় আমাদের সূর্য । আমাদের সূর্য মেঘটির কেন্দ্রের স্থান দখল করে ছিল। এরপর আশেপাশের সকল বস্তু চাকতির ন্যায় আকৃতি ধারণ করতে শুরু করে। আশেপাশের সকল বস্তু সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে শুরু করে। তখন অনুবীক্ষণিক ধূলিকণার বস্তুগুলো একে অপরকে আরও বেশি আকর্ষণ করতে শুরু করে।

স্বল্প ভররের বস্তু হতে অধিক ভরের বস্তুর সৃষ্টি হতে থাকে। আস্তে আস্তে বস্তুগুলো বড় হতে হতে একসময় গ্রহাণুতে রূপান্তর হয়ে পড়ে। এর থেকেও বড়গুলো গ্রহে পরিণত হয়। আমাদের পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহগুলো ঠিক এভাবেই সৃষ্টি হয়।

আমাদের পৃথিবী (মি.পার্ফেক্ট) যদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বস্তু বা পাথর দ্বারা সৃষ্টি হয়ে থাকে তবে বেশ অনেকগুলো বস্তুদ্বয়ের প্রয়োজন হয়েছিল এটি সৃষ্টিতে। যদি মনে করা হয়,প্রতিটি বস্তু বা পাথর গোলাকার এবং এদের ব্যাস ১০০ কি.মি হয় যার ফলে এদের ঘনত্ব হয় 3500 kg/m^3
হয় । তবে এরূপ ৩ মিলিয়নটি পাথর মিলে তৈরি হবে আমাদের পৃথিবী। ব্যাপারটার গাণিতিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছি।

আমরা জানি, বস্তুটির মোট ভর হবে,
M=ρ.V

এখানে,
ρ হলো বস্তুটির ঘনত্ব (Density)। কোন বস্তুর একক আয়তনের ভরকে তার ঘনত্ব (Density) বলে। ঘনত্বকে সাধারণত (ρ) (গ্রীক অক্ষর 'রো'-এর লোয়ার কেস) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এটি সাধারণ Kg/m^3 দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

V হলো আয়তন(Volume)। ত্রিমাত্রিক স্থানে একটি বস্তু যে আকার ধারণ করে তাকে আয়তন বলে। এটি মিটার কিউবে (M^3) হিসাব করা হয়। কোনো গোলকের পৃষ্ঠদেশের ক্ষেত্রফল হবে 4πr^2 এবং এর আয়তন 4/3πr^3 ।
তাহলে ভর বের করতে হবে আমাদের আগে আয়তন বের করতে হবে। আয়তন বের করতে হলে বস্তুটির ব্যাসার্ধ বের করতে হবে।

ব্যাস যেহেতু 100 k.m
সুতরাং ব্যাসার্ধ= 100/2=50 K.m
V=4/3πr^3
V=4/3×3.14164×50^3 km^3
V= 5.2× 10^5 km^3

আমরা আয়তন পেয়ে গেছি। আর ঘনত্ব আগেই বলাছিল । তাহলে,
M=ρ.V
M=3500 kg/m^3 5.2× 10^5 km^3
M≈2×10^9 kg/m^3.km^3

আমরা একটি পাথরের ভর পেয়ে গেছি। এবার কিলোমিটারকে মিটারে পরিণত করি।
M=2×10^9 kg/m^3×km^3×(1000m/­km)^3
M=2×10^9 kg/m^3×km^3×1×10^9 m^3/km^3
M=2×10^18 kg

এবার আমরা সর্বশেষ কাজটুকু করবো।

আমরা জানি,
পৃথিবীর ভর,Me=6×10^24 kg
আবার,
Number=Me/Mp (Me=Mass of earth, Mp= Mass of planetesimal)
Number=6×10^24 kg/2×10^18 kg
Number=3×10^6
Number=3000000

তাহলে খুব সুন্দর গাণিতিকভাবে আমরা পেয়ে গেলাম, ১০০ কি.মি ব্যাসের ৩ মিলিয়ন পাথর দ্বারা পৃথিবী আকৃতির একটি গ্রহ সৃষ্টি হওয়া সম্ভব হবে ।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ শেষ পর্যন্ত পড়ার জন্য। সবাই মিম খুব পছন্দ করে, লাইক,শেয়ার দেয়। কিন্তু যেগুলো আমাদের নিজেদের জানা দরকার এবং অন্যদেরও জানানো দরকার ওইগুলো খুব স্বল্প সংখ্যকরাই পছন্দ করছে। বিজ্ঞানের ভাষা হচ্ছে গণিত। গণিত ছাড়া বিজ্ঞান পঙ্গুর মতো। আর বিজ্ঞানের এই গুরুত্বপূর্ণ শাখাটিও (জ্যোতির্বিদ্যা বা জ্যোতির্বিজ্ঞান) এই ধারার ব্যতিক্রম নয়। এতেও গণিত অসাধারণ ভূমিকা রাখে। তাই গণিতকেও ভালোবাসতে হবে,চর্চা করতে হবে।

 রেফারেন্স: Schaum's Outline of Astronomy - Stacey Palen

অসীম এই মহাবিশ্বের কেন্দ্র এবং সীমানা কোথায়?

মহাবিশ্ব
আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে তা আমরা প্রায় সবাই জানি। ১৩.৮ বিলিয়ন বছর ধরে এটি প্রসারিত হচ্ছে । আর প্রতি মুহূর্তে এই প্রসারনের হারও বাড়ছে । এ প্রসারনের হার বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো ডার্ক ম্যাটার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে মহাবিশ্বের শেষ সীমানা কোথায়? বেলুন যদিও প্রসারিত হয় তবুও কিন্তু এর পৃষ্ঠ নামক এক সীমা আছে। কিন্তু মহাবিশ্বের একেবারে শেষ সীমানা কোথায়? আর সীমার পরে কি অন্য কিছু অবস্থান করছে?

মহাবিশ্ব বলতে আমরা অনেকেই ১৩.৮ বিলিয়ন আলোকবর্ষ ব্যাসার্ধ বিশিষ্ট গোলক ভাবি। কারন বিগ ব্যাং এর পরে আলো মাত্র ১৩.৮ বিলিয়ন আলোকবর্ষ পর্যন্ত পৌঁছেছে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে আমাদের এই ধারনাটি খুব বড় ধরনের ভুল। আপনি মনে মনে ১৩.৮ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দুরের একটি বস্তু কল্পনা করুন। আমরা জানি মহাবিশ্বের সব কিছু একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে (নিকট পরিধি ব্যাতিত)। সেই হিসেবে আলো যখন ১৩.৮ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে থেকে যাত্রা করে আমাদের চোখে পৌঁছে ততক্ষণে এটি কিন্তু আবার আমাদের বিপরিতে আরও দূরে সরে গেছে ।

শুধু তাই নয় মহাবিশ্বও প্রসারিত হচ্ছে। গোলমেলে মনে হলে একটি কাঁচা কেকের দলা ধরে নিতে পারেন । এর মধ্যে আপনি দুইটি চকলেট জেমস ফেলে যদি কেকটিকে বেক করেন, তাহলে দুইটি জেমসের অন্তর্বর্তী দূরত্বও বাড়বে এবং একই সাথে কেকের আকৃতিও বাড়বে। মহাবিশ্বের বস্তুগুলো সেচ্ছায় দূরে যাচ্ছে না। বরং তাদেরকে বাধ্য করে দূরে চালনা করা হচ্ছে। আর এই চালনাশক্তিই হল স্থানের প্রসারন! 

আমরা মহাবিশ্বের শেষ যে সীমা অবদী দেখতে পারি, তাকে দৃশ্যমান মহাবিশ্ব বলে। দুরতম বস্তুদের লোহিত সরন হিসেব কোরে দৃশ্যমান মহাবিশ্বের ব্যাসার্ধ মোটামুটি ৪৬.৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ নির্ধারিত হয়েছে! অর্থাৎ দৃশ্যমান মহাবিশ্ব হল ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ ব্যাসের এক বিশাল গোলক । মহাবিশ্ব যদি গোলকই হয় তাহলে নিশ্চয় এর কেন্দ্রও থাকবে। তাহলে মহাবিশ্বের কেন্দ্র কোথায়? এর জন্য আমাদের হাবল গোলক নামে একটি টার্ম বুঝতে হবে । হাবল গোলক হল মহাবিশ্বের একটি গোলকীয় অঞ্চল যার কেন্দ্রে অবস্থিত কোন দর্শকের সাপেক্ষে উক্ত গোলকীয় অঞ্চলের বাহিরের বস্তু মহাবিশ্বের প্রসারণের দরুন আলোর চাইতে বেশি গতিতে দ্রুত সরে যাচ্ছে। অনেকে দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সাথে হাবলের গোলককে মিলিয়ে ফেলেন। কিন্তু বাস্তবে হাবলের গোলকের চাইতে দৃশ্যমান মহাবিশ্ব আরও অনেক বেশি বড়। হাবলের গোলক মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানে কল্পনা করা যায়। হাবলের গোলকের ব্যাসার্ধ হল, c/H0 . এখানে c = আলোর বেগ আর H0 = হাবলের ধ্রূবক । হাবল গোলকের আয়তন হল (c/H0)^3। এই সুত্র ও হাবলের ধ্রূবকের সঠিকতম মান অনুযায়ী হাবল গোলকের আয়তন হল ১০^৩১ ঘন আলোকবর্ষ। আর হাবল গোলকের ব্যাসার্ধ হল ১৪ বিলিয়ন আলোকবর্ষ যা মহাবিশ্বের বয়স(১৩.৮ বিলিয়ন বছর) ও আলোর গতির গুণফলের কিছু বড়। 

মহাবিশ্বের যেকোনো বিন্দু সাপেক্ষে এই গোলক কল্পনা করা গেলেও যেকোনো বিন্দু সাপেক্ষে হাবলের গোলকের আয়তন সমান। নিচের চিত্রটির গোলাপি হাবল গোলক ও সবুজ হাবল গোলকের আয়তন একই হলেও গোলাপি গোলকের দর্শকের সাপেক্ষে এর বাহিরে অবস্থিত বস্তু আলোর চাইতে বেশি গতি সম্পন্ন । কিন্তু একই বস্তু যদি সবুজ গোলকের মাঝে অবস্থান করে তাহলে সবুজ হাবল গোলকের দর্শকের নিকট তা আলোর চাইতে কম গতিসম্পন্ন। হাবল গোলকের পৃষ্ঠকে হাবল পৃষ্ঠ বা হাবল দিগন্তও বলে , হাবলের দিগন্তে অবস্থিত বস্তুর বেগ একদম আলোর বেগের সমান । হাবলের গোলকের বাহিরে অবস্থিত বস্তু আলোর চাইতে বেশি দ্রুত গতিতে সরে যায় । কিন্তু আলোর চাইতে বেশি দ্রুত ছোটা মানে যে আমাদের নিকটে তার আলো পৌছাবে না এমনটি না । কারন দৃশ্যমান মহাবিশ্বও প্রসারিত হচ্ছে । আর দৃশ্যমান মহাবিশ্বের প্রসারণের হার যদি হাবল গোলকের বহিঃস্থ কোন বস্তুর গতির চাইতে বেশি হয় তাহলে তা দৃশ্যমান মহাবিশ্বের মধ্যে অবস্থান করবে। আর বস্তুটি কর্তৃক নিঃসৃত আলোও আমাদের নিকটে পৌঁছাবে। 
মহাবিশ্বের মডেল
তাহলে মহাবিশ্বের কি নির্দিষ্ট কেন্দ্র নেই? কার্ল স্যেগানের এক বিখ্যাত উক্তি হল, "আমরা কে? আমরা এক অস্বাভাবিক গ্রহে বাস করি যার সাদামাটা তারাটি গ্যালাক্সির মধ্যে লুকিয়ে আছে, গ্যালাক্সিটি এমন এক মহাবিশ্বের এক কোনায় আছে যেখানে মানুষের চাইতে গ্যালাক্সির সংখ্যা বেশি!" 
মুলত তিনি কোপারনিকান মূলনীতির আলোকে এই কথাগুলো বলেছেন! কোপার্নিকাসের মুলনীতি অনুযায়ী "আমাদের পৃথিবী কোন কেন্দ্রীয় বা বিশেষভাবে সুদর্শন ও অনুগ্রহ প্রাপ্ত অবস্থানে নেই"। কোপার্নিকাসের এই কথা গুলি তৎকালীন ধর্মীয় ও বিজ্ঞান সমাজে ব্যাপক সামালোচনার ঝড় বইয়ে নিয়ে আসে। এই মূলনীতি আঁকড়ে ধরে জিওর্দার্নো ব্রূনো আর গ্যালিলিও বরন করেন অকল্পনীয় নির্যাতন। তবে ধীরে ধীরে তা জনমনে যায়গা করে নিল। পৃথিবীকেন্দ্রিক থেকে সূর্যকেন্দ্রিক জগত ব্যাবস্থার অবসান ঘটল যখন মানুষ আকাশের হাজার হাজার নক্ষত্রের আসল রূপ বুঝতে শিখল । মানুষ জানল সূর্য কেবল ছায়াপথের লাখো নক্ষত্রের মাঝে সাধারন এক নক্ষত্র! 

হাবলের রেডশিফটের মাধ্যমে মহাবিশ্বের প্রসারণ আবিস্কারের পূর্ব পর্যন্ত মানুষ ভাবত আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথকেই পুরো মহাবিশ্ব ভাবত, আর এর কেন্দ্র মানেই মহাবিশ্বএর কেন্দ্র! হাবল আইনস্টাইনের স্থিতিশীল মহাবিশ্ব ধারনার অবসান ঘটিয়ে প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারনার অবতারনা করলেন। তখনই আমরা জানলাম সব কিছু একে অন্যের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, সেই অর্থে মহাবিশ্ব একটি মাত্র বিন্দু থেকে সৃষ্টি হয়েছে। আমরা আধুনিক যুগে জানি পৃথিবী মোটেও সবকিছুর কেন্দ্রস্থল না! বরং মহাজাগতিক কাঠামোর তুলনায় পৃথিবী কিছুই না। আমরা যদিও বা এগুলো সম্পর্কে অবগত, তারপরেও আমরা জানতে চাই মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থল কোথায়! মহাবিশ্ব সিংগুল্যারিটি বা অদ্বৈত বিন্দু থেকে বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে জন্মলাভ করেছে ! সেই হিসেবে মহাবিশ্বের নিশ্চয় কেন্দ্র থাকা উচিৎ ! তাহলে কোথায় সেই কেন্দ্র ! একটু আগেই আমরা হাবল গোলক নিয়ে জেনেছি। মহাবিশ্বের যেকোনো বিন্দু সাপেক্ষে এই গোলক কল্পনা করা গেলেও যেকোনো বিন্দু সাপেক্ষে হাবলের গোলকের আয়তন সমান। অর্থাৎ আপনি মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানে এই গোলক কল্পনা করতে পারবেন। আর সেই স্থান সাপেক্ষে এই গোলকের কেন্দ্রই হল সব কিছুর কেন্দ্র!

আমরা আমাদের পৃথিবী বা সৌরজগতে অবস্থান করলে আমরা মহাবিশ্বের অন্য প্রান্তের অনেক কিছুই দেখতে পারি না! কিন্তু আমরা যদি আমাদের প্রতিবেশী ধ্রূবমাতা বা আন্ড্রোমেডা গ্যালাক্সিতে অবস্থান করি তাহলে মহাবিশ্বের অন্যপ্রান্তের কিছু বস্তু যেমন বেশি দেখব তেমন মিল্কিওয়ের দিকের প্রান্তের অনেককিছু কম দেখব । অর্থাৎ সবকিছু অবস্থান সাপেক্ষে । আমাদের মহাবিশ্বের কেন্দ্রও তাই ! আমাদের মহাবিশ্ব হল বুদবুদের পৃষ্ঠের মত। সময়ের সাথে সাথে এটি বাড়তেই আছে আর থাকবেও। এখন ভাবছেন , মহাবিশ্ব যদি বুদবুদ বা কোন গোলকের আকৃতির হয় তাহলে নিশ্চয় এর কেন্দ্র হল গোলকের কেন্দ্রের মত একদম মাঝামাঝিতে ! ঠিক পৃথিবীর কেন্দ্র যেমন মাঝামাঝিতে। দুই লাইন আগের বাক্যটি আরেকবার পড়ুন! মহাবিশ্ব হল বুদবুদের পৃষ্ঠের মত ,পুরো বুদবুদের মত না! 

আমরা ত্রিমাত্রিক জীব, আর আমাদের মহাবিশ্বও ৩ স্থান মাত্রার সমন্বয়ে গঠিত! একবার আমরা নিজেদেরকে একটি দ্বিমাত্রিক পিঁপড়ে ভাবি। মানে আমরা সামনে-পিছনে, ডানে-বামে চলতে পারি। কিন্তু লাফিয়ে উপরে উঠতে পারি না! আমরা যদি কোন ফুটবলের পৃষ্ঠে অবস্থান করি। তাহলে আমরা পুরো ফুটবল ভ্রমন করেও কিন্তু কোন কেন্দ্র পাব না! কারন গোলকের পৃষ্ঠের কোন কেন্দ্র থাকতে পারে না! একইভাবে পৃথিবীর ভুপৃষ্ঠের যেমন কোন কেন্দ্র নেই! একইভাবে আমাদের মহাবিশ্বের গঠনও এমন । আমাদের মহাবিশ্বের যা কিছু আছে সব এক মহাজাগতিক বুদবুদ বা গোলকের পৃষ্ঠে। এই মহাজাগতিক বুদবুদই হল আমাদের মহাবিশ্ব , আমাদের বাড়ি , আমরা জা কিছু দেখি , যা কিছু ভালবাসি, যা কিছু চাই, সব এখানেই অবস্থিত। বিগ ব্যাং বলতে আমরা বিরাট বিস্ফোরন বুঝি, কিন্তু বিগ ব্যাং মোটেও কোন গ্রেনেডের বিস্ফোরণের মত ছিল না । এটি ছিল শূন্য মাত্রার এক বিন্দুর পৃষ্ঠের প্রসারণ! সময়ের সাথে যে পৃষ্ঠ বাড়ছেই। 

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় মহাবিশ্বে কি আকৃতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে বা হবে! আমরা মহাবিশ্বকে বাবল ইউনিভার্স বা বুদবুদের পৃষ্ঠের সাথে তুলনা করি ! তবে আমাদের চিরচেনা সাবানের বুদবুদ বা গোলকের পৃষ্ঠের মত এতটাও সাদামাটা না! মহাবিশ্বকে বুঝানো হয় অসীম সমতল স্থান-কালের (Asymptotically flat Space-Time) মাধ্যমে। এমন একটি স্থান-কাল যেখানে যেকোনো বৃহদায়তন বস্তুর থেকে দূরে যেতে থাকলে স্থানকে সমতল মনে হয়। কার্তেসীয় জ্যামিতিতে এমন একটি সূক্ষ্ম বক্র রেখার কথা ভাবুন যা যেকোনো এক/দুই অক্ষের সাপেক্ষে নিকট থেকে নিকটতম অবস্থান দিয়ে অতিক্রম করছে কিন্তু কখনো অক্ষটিকে ছেদ করবে না!

অসীম সমতলের একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য হল এটিকে কেবল প্রসারণশীল বা সংকোচনশীল স্থান-কালের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা করা যায় ! নক্ষত্র থেকে সুপারনোভার মাধ্যমে কেন্দ্র ব্লাকহোলে পরিণত হওয়া বা মহাবিশ্বের প্রসারণ যার আদর্শ উধাহরন! অর্থাৎ মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে ঠিকই কিন্তু এর থেকে কোন ফোটন বাহিরে আর যাবে না বা অসীমে হারিয়ে যেতে পারে না ! ব্লাকহোলের আপাত দিগন্তের (Apparent Horizon) ক্ষেত্রেও অনেকটা এমন । নক্ষত্র থেকে ব্লাকহোলে পরিণত হওয়ার সময় স্থান কাল সংকুচিত হতে থাকবে । এ সময় আপাত ঘটনা দিগন্তের একটু বাহিরে কিছু ফোটন থাকবে যারা ব্লাকহোল থেকে বাহিরে ও ভিতরে উভয় দিকে যেতে চাইবে । কিন্তু যেহেতু ব্লাকহোলে পদার্থ পতিত হচ্ছে । তাই এর ঘটনা দিগন্তের আকৃতিও বাড়ছে । ফলস্বরূপ কোন ফোটনই আর মুক্ত হবে না ! অর্থাৎ তা অসিমতায়(মহাবিশ্বে) হারিয়ে না গিয়ে ব্লাকহোলেই থেকে যাবে ! ফলস্বরূপ ব্লাকহোলের ভিতরে থাকা ফোটন আর মুক্তি পাবে না অর্থাৎ আর কোন কিছুকে দেখা যাবে না ! কিন্তু প্রসারণশীল মহাবিশ্ব ও ব্লাকহোলের পৃষ্ঠ উভয় ক্ষেত্রে স্থান হল অসীম সমতল। অর্থাৎ আমাদের কার্তেসিয় স্থানাংকে কল্পিত সেই রেখার মত!

সময়কে ধ্রূব ধরে কেবল স্থানিক (Spatial) ব্যাখ্যার মাধ্যমে অসীম সমতলের ভাল ব্যাখ্যা পাওয়া যায়! আপনি যেখানেই যে দিকেই যান না কেন সব কিছু একইরকম দেখবেন! আপনি যেখানেই থাকুন না কেন সব কিছু আপনার থেকে দূরে সরে যেতেই থাকবে! আপনি যে অবস্থানে যাবেন তা কোনকিছুর আদি বা শেষ না ! অর্থাৎ জ্যামিতিকভাবে আপনি একইরূপ (Homogeneous) স্থান-কাল দেখবেন আর সবদিকে একই রূপ পদার্থ দেখবেন ! আইনস্টাইনের আপেক্ষিক ক্ষেত্র তত্ত্ব ব্যাবহার করে মহাবিশ্বকে অসীম সমতল ধরে এফএলআরডব্লিউ(ফ্রিদমান-ল্যমেত্র্‌-রবার্টসন-ওয়াকার মেট্রিক) মহাবিশ্ব নামক এক মডেলের ধারনা আছে আমাদের মহাবিশ্বের একটি গ্রহনযোগ্য মডেল হিসেবে ধরা হয় ! যা নিয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে।

সম্পূর্ণ হীরার তৈরি বিশাল নক্ষত্র যার দাম পুরো পৃথিবী বিক্রি করলেও উঠবে না

ডাইমন্ড স্টার
পৃথিবীতে পাওয়া সবচাইতে বড় হীরা হল ক্যালিনান ডায়মন্ড। এর ভর ৬২১.৩৫০ গ্রাম এবং একে পাওয়া গিয়েছিল ১৯০৫ সালে দক্ষিন আফ্রিকার কোনো একটি জায়গায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সন্ধান পাওয়া সবচাইতে বড় হীরা এটি না ! এমনকি এটি পৃথিবীতেও অবস্থিত না ! আর পৃথিবীতে থাকতই বা কীভাবে ? এই হীরার আকৃতি পৃথিবীর চাইতেও বড় আর ভরে সূর্যের ভরের ১.০৫ গুন । মহাজাগতিক এই দানব হিরাটির অবস্থান ৯০০ আলোকবর্ষ দূরে কুম্ভ নক্ষত্রমণ্ডলে (Aquarius constelltion) ! মুলত এটি একটি শ্বেত বামন বা White Dwarf নক্ষত্র। সূর্যের মত প্রধান ধারার নক্ষত্রগুলি বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে কেন্দ্রে হাইড্রোজেন গ্যাস ফিউশন বিক্রিয়ায় ব্যাবহার করে তাপ ও আলো উৎপন্ন করে। বিক্রিয়া্র ফলে অপেক্ষাকৃত ভারী মৌল হিলিয়ামও উৎপন্ন হয়।যখন নক্ষত্রটি হাইড্রোজেন জ্বালানী নিঃশেষ করে ফেলে তখন এটি এর কেন্দ্রীনস্থ হিলিয়াম পোড়াতে শুরু করে। হিলিয়াম থেকে আবার কার্বন,অক্সিজেন,নাইট্রোজেন উৎপাদন হতে শুরু করে।

ভর বিবেচনায় একেক নক্ষত্রের পরিনতি একেক রকম । নক্ষত্রের বিবর্তনের সম্ভাব্য একটি পরিনতি হল শ্বেত বামন । যদি কোনো নক্ষত্রের মোট ভর সূর্যের ১.৪১ গুণের সমান বা তার চেয়ে কম হয়, তাহলে ওই নক্ষত্র শেষ দশায় শ্বেত বামন তারায় পরিণত হয়। হাইড্রোজেন জ্বালানী শেষ করার পরে এটি যখন হিলিয়াম পড়ানোর প্রস্তুতি নেয় তখন এটি প্রসারিত হয়ে রেড জায়ান্ট না লোহিত দানব নক্ষত্রে পরিণত হয় । এই সময় এদের ব্যাস বেড়ে সূর্য ও পৃথিবীর সমান দূরত্বের হয় । তবে এর কেন্দ্রে ভারী মৌল জমে থাকায় এটির প্রসারনের বিপরীতে মহাকর্ষ একে সংকুচিত করতে চায় । লোহিত দানব তারা'র অভ্যন্তরভাগ অতি সঙ্কোচনের কারণে, যখন এর আভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ১০^৮ কেল্ভিন এবং ঘনত্বের পরিমাণ ১০^৮ গ্রাম/বর্গ সেন্টিমিটার হয়, তখন নক্ষত্রের ভিতরে জমে থাকা হিলিয়ামের দহন শুরু হয়। প্রথাবস্থায় হিলিয়াম সংযোজিত হয়ে বেরেলিয়াম-৮ তৈরি করে।এরপর বেরিলিয়াম-৮ এর সাথে আরও একটি হিলিয়ামের সাথে যুক্ত হয়ে তৈরি হয় কার্বন-১২ তৈরি করে। এই অবস্থায় হিলিয়াম ঝলক (helium flash)- এর সৃষ্টি হয়। হিলিয়াম শেষ হয়ে গেলে নক্ষত্রটি গ্য্যাস নিঃসরণ করতে থাকে । নিঃসৃত গ্যাস থেকে গ্রহান্বিত নিহারিকার জন্ম ঘটে । আর হিলিয়াম দহন শেষে নক্ষত্রটির ভারী মৌল সমৃদ্ধ কেন্দ্রীণ বা কোর শ্বেত বামন (white dwarf) নক্ষত্রে পরিণত হয়। শ্বেত বামন নক্ষত্র এত ঘন যে সূর্যের সমান ভরসম্পন্ন একেকটি শ্বেত বামন নক্ষত্রের আকৃতি পৃথিবীর সমান মাত্র ।

আমাদের আলোচিত শ্বেত বামন তারকাটিকে খুজে পাওয়া সহজসাধ্য ছিল না । নেদারল্যান্ডের একদল বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুযায়ী স্থান-কাল জালে পালসারের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছিলেন । ২০১৪ সালে ডাচ ইন্সটিটিউট অফ রেডিও অ্যাস্ট্রোনমির(ASTRON) গবেষকেরা ৯০০ আলোকবর্ষ দূরে একই অঞ্চলে PSR J2222-0137 নিয়ে গবেষণা করছিলেন । কিন্তু পালসার থেকে নিঃসরিত আলোর ঝলকানি বা ফ্ল্যাশ মাঝে মাঝে পৃথিবীতে আসতে একটু বেশি সময় নিচ্ছিল । পালসার হল একধরনের ঘূর্ণিয়মান নিউট্রন নক্ষত্র ! নিউট্রন নক্ষত্র হল উচ্চ ঘনত্ব যুক্ত নক্ষত্র । এই ধরনের নক্ষত্রের ভর সূর্যের চাইতে সামান্য কিছু বেশি হয় আর এত বিপুল পরিমান ভর মাত্র ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের গোলকের সমান স্থানে পুঞ্জীভূত থাকে । যাই হোক নিউট্রন তারার গঠন আর বিবর্তন নিয়ে অনেক আগেই আমরা জেনেছি ! PSR J2222-0137 পালসারটির ভর ১.১০ সৌরভরের সমান এবং এটি নিজ অক্ষে সেকেন্ডে ৩০ বার আবর্তন করে ।

ডাচ বিজ্ঞানীরা এর ফ্লাশের সময়ক্ষেপণের কারন হিসেবে দ্বিতীয় কোন একটি নক্ষত্র থাকার অনুমান করেন । যার মহাকর্ষীয় প্রভাবে পালসারের ফ্ল্যাশ পৃথিবীতে পৌছাতে কালক্ষেপণ হচ্ছে ! কিন্তু তারা রেডিও ও এক্স রে টেলিস্কোপ ব্যাবহার করে তা সনাক্ত করতে বার্থ হন । তারা অনুমান করলেন যে দ্বিতীয় নক্ষত্রটি বেশ শীতল বিধায় এটি থেকে বিকিরনের হার কম তাই এটি একই সাথে বেশ অনুজ্জ্বলও বটে । এরপর তারা চিলির Southern Astrophysical Research (SOAR) টেলিস্কোপ ব্যাবহার করে সাধারন শ্বেত বামন নক্ষত্রের চাইতে ১০ গুন অনুজ্জ্বল একটি শ্বেত বামন নক্ষত্রের সন্ধান পেলেন । প্রাপ্ত শ্বেত বামন তারকাটির তাপমাত্রা মাত্র ২৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস । যা তারাদের তাপমাত্রার মাপকাঠিতে শীতল ! শ্বেত বামন তারকা কার্বন সমৃদ্ধ হয় এবং এমন তাপমাত্রায় এই কার্বন হীরার মত স্ফটিক বা ক্রিস্টালরূপে থাকে ! তাই ধারনা করা হচ্ছে এই শীতল শ্বেত বামন তারকাটি একটি বিশাল মহাজাগতিক হীরা ! শ্বেত বামন তারকাদের খুব ধীরে ধীরে তাপমাত্রা হ্রাস পেতে থাকে ! আলোচিত শ্বেত বামন তারকাটির বয়স ১১ বিলিয়ন বছর যা আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের বয়সের প্রায় সমান !

পৃথিবীর সবচাইতে বড় হীরা ক্যালিনান ডায়মন্ডের বর্তমান মালিক ব্রিটেনের মহারানি এলিজাবেথ II । তবে মহাজাগতিক এই হীরার নক্ষত্রের মালিক চাইলে আপনিও হতে পারেন ! শুধু যেতে হবে মাত্র ৯০০ আলোকবর্ষ দূরে!